Sunday, 20 September 2015

শিবিরের ক্রান্তিকালঃ ১৯৮২ সালের কথকতা-৫

এক সময় বৈঠক শুরু হলো। দুয়েকটি প্রাথমিক কথা বলে আমি প্রফেসার সাহেবকে তার ফায়সালা ঘোষণা করতে বললাম। তিনি তাঁর স্বভাব সুলভ ভাষায় যতটুকু সম্ভব মাধুর্য ও আবেগ মিশিয়ে দীর্ঘক্ষণ ভূমিকা দিলেন। তারপর তাঁর ফাইন্ডিংস এবং ফায়সালা শোনালেন। আজ এতদিন পর সব কথা মনে নেই। যতটুকু মনে পড়ে তাঁর সারকথা ছিলঃ
(১) যেহেতু সদস্যদের মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে সেহেতু বর্তমান নেতৃত্বকে চলে যেতে হবে। (নোটঃ শাহ জাহান চৌধুরীর এটা দাবি ছিল এবং অনাস্থা এমনিতে সৃষ্টি হয়নি, অনাস্থার জন্যে জামাতের সহযোগিতায় প্রচারণা চালানো হয়েছে।)
(২) অনতিবিলম্বে নতুন নির্বাচন হবে এবং নির্বাচন সম্পন্ন করার কাজে মেম্বার সেক্রেটারী হিসেবে কাজ করবেন নজরুল ইসলাম খাদেম। (নোটঃ কেন নজরুল ইসলাম খাদেমকে তড়িঘড়ি করে বিদেশ থেকে ডেকে আনা হয়েছে তা আমার কাছে পরিস্কার হলো।)
(৩) নির্বাচনের আগে কার্যকরী পরিষদের যারা নিয়মিত ছাত্র নয় তাদের সবাইকে বিদায় নিতে হবে। (নোটঃ তাদের মধ্যে আমিও একজন ছিলাম। এর মাধ্যমে, আমরা মিছামিছি ছাত্রত্ব বজায় রেখে জোর করে সংগঠনে রয়েছি, শাহ জাহান চৌধুরীর এ অভিযোগের সত্যতা প্রদান করা হলো।)
(৪) সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বিরোধী কাজ করে শপথ ভঙ্গের কাফফারা হিসেবে শাহ জাহান চৌধুরীকে তওবা করতে হবে এবং তিনটি রোজা রাখতে হবে।
(৫) প্রফেসার সাহেব নিজে এ সকল ফায়সালা সদস্যদের অবহিত করবেন। প্রথমে ঢাকার সদস্যদের জানানো হবে। পরে সারা দেশের সদস্যদের বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত করে ঢাকায় ডেকে আনা হবে।
প্রফেসার সাহেবের কথা শেষ হলে আমরা সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে সুবোধ বালকের মতো নিজ নিজ বাসায় চলে গেলাম। পরে প্রফেসার সাহেব যখন বিভিন্ন এলাকার সদস্যদের সাথে কথা বলেন তখন আমি মাত্র একটি বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম। অন্যগুলোতে আমি ইচ্ছে করেই উপস্থিত হইনি। পরিষদ সদস্যের মধ্যে যারা একাধিক বৈঠকে ছিলেন তারা বলেছেন সকল বৈঠকে তাঁর ভাষা, বাচনভঙ্গী এবং দৃষ্টিকোণ সমান ছিল না। তবে মূল বক্তব্য একই ছিল, বর্তমান ব্যাচের বিদায় এবং শাহ জাহান চৌধুরীর ছেলে ভোলানো তওবা।
আমি যে বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম সেখানে প্রফেসার সাহেব অনেক অপ্রাসঙ্গিক কথা টেনে এনেছেন। সেখানে তাকে চ্যালেঞ্জ করার কোন পরিবেশ বা সুযোগ ছিল না। ৭১ সম্পর্কে তিনি খুব শক্তভাবে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘৭১-এ জামাতের ভুমিকা নিয়ে প্রশ্ন উত্তাপনের কোন সুযোগ নেই। ‘৭১ আমাদের ক্রেডেনশিয়েল’
সাইফুল আলম খান মিলন, সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি (ছবি উৎস: ছাত্র শিবির ওয়েবসাইট)
সাইফুল আলম খান মিলন, সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি (ছবি উৎস: ছাত্র শিবির ওয়েবসাইট)
জামাতের প্রত্যক্ষ খবরদারিতে একই সেশনে শিবিরের তিন বার নির্বাচন হলো। তৃতীয় নির্বাচনে সাইফুল আলম খান মিলন কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হলেন। ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ আমাদের বুঝিয়ে দিলেন, ইসলামী পলিটিক্স কাহাকে বলে, এবং তা কত প্রকার ও কি কি। স্বপ্নভঙ্গ বুকে ধারণ করে এখন আমার তল্পিতল্পা গুটিয়ে সিলেট যাবার পালা। আহমদ আব্দুল কাদের, ডাঃ আবিদুর রহমানসহ আরো অনেকে আমাকে ঢাকায় থাকতে বলছেন। প্রিয়ভাজন এডভোকেট এ কে বদরুদ্দোজা আমার জন্যে একটি চাকরিও জোগাড় করে ফেলেছেন, ঢাকার একটা সাপ্তাহিক কাগজের সম্পাদকীয় বিভাগে। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল। আমি আর ঢাকায় থাকবো না।
আমার আজিম পুরের বাসায় তখন অনেকেই আসতেন। সদ্য বিদায়ী কেন্দ্রীয় সভাপতি আহমদ আব্দুল কাদের আসতেন। পরিষদ সদস্যদের মধ্যে আসতেন জসিম উদ্দীন সরকার, আশেক আহমদ জেবাল, মুহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, মাসুদ মজুমদার প্রমুখ। কিছুদিন আগে বিদায় নেয়া পরিষদ সদস্য ডাঃ আবিদুর রহমানও আসতেন। আমরা নানা প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করতাম, সুখ-দুঃখের গল্প করতাম। নিজের কথা বলতে পারি, অনেক অনেক বছর পর এমন একটা অবস্থা সৃষ্টি হলো যে আমার উপর কোন দায়িত্ব নেই। ভালো বা খারপের বিষয় নয়, এ একটা ভিন্নতর অনুভূতি। তবে আমাদের সব আলোচনার মধ্যে ঘুরে ফিরে একটি প্রশ্ন আসতো, এখন আমরা কি করবো?
১৯৭৭ সালে শিবির গঠনের পর একটা বিরাট স্বপ্ন নিয়ে আমরা মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। আমাদের স্বপ্ন ছিল শিাবরকে বিশেষ কোন দলের নয়, বাংলাদেশের সকল মানুষের আশা-আকাঙ্খার প্রতীক হিসেবে গড়ে তুলবো। ৭১এর ভুমিকা এবং আলেম সমাজের জামাত বিরোধী মনোভাবের কারণে জামাতের ব্যাপারে বাংলাদেশের মানুষের মনে অসংখ্য প্রশ্ন রয়েছে। শুরু থেকে আমরা বলিষ্ঠভাবে বলেছি, শিবির কারো অঙ্গ সংগঠন নয় আমরা জামাত থেকে নিরাপদ দূরত্বে থেকে শিবিরকে গ্রামে-গঞ্জে পৌঁছে দিতে পেরেছি। দেশের রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, আমলা এবং অন্যান্য পেশাজীবীদের মধ্যে অনেক প্রভাশালী ব্যক্তিত্ব রয়েছেন যারা জামাতকে পছন্দ করেন না, কিন্তু শিবিরকে ভালোবাসেন। আভ্যন্তরীন এবং বাইরের অনেক বাঁধা-বিপত্তি মোকাবেলা করে শিবির দিনে দিনে এগিয়ে চলেছে। প্রাক্তন শিবিরকর্মীদের নিয়ে প্রস্তাবিত সংগঠন গড়ে তুলতে পারলে শিবির একটি অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে গড়ে উঠতে পারতো। কিন্তু এখন কি হবে? আমাদের সাথে যা করা হলো এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া শিবিরের উপর পড়বে। শিবির এখন জামাতের ছাত্র সংগঠন হিসেবে পরিচিত হবে এবং আস্তে আস্তে গণমানুষের আস্থা ও সমর্থন হারাবে।
৭১-এ জামাতের ভুমিকার কারণে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সাথে তাদের এক বিরাট দূরত্ব তৈরি হয়েছে। অপরদিকে বাংলাদেশের মসজিদ-মাদ্রাসায় যে সকল আলেম যুগ যুগ ধরে গণমানুষের ধর্মীয় নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন তারা জামাতকে পছন্দ করেন না। জামাতে ইসলামী বাংলাদেশে নতুন নামে কাজ শুরু করলে এ দুটো বাঁধা অতিক্রম করা সহজ ছিল। জামাতে ইসলামী নামটা কুরআন-হাদীস নয় যে একে পরিবর্তন করা যাবেনা। কিন্তু জামাত নাম পরিবর্তন না করে স্বনামেই কাজ শুরু করেছে। নেতৃত্বেও রয়েছেন তারা-ই যারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ছিলেন এবং এ ব্যাপারে জামাতের অবস্থান কোন গোপন বিষয় ছিল না। পরিচিত মুখগুলো-ই আবার নেতৃত্বের আসনে সমাসীন। তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ৭১ সালের ভূমিকা জামাতকে সব সময় তাড়া করে বেড়াবে।
আলেম সমাজের সাথে বিরোধও কোন ছোট বিষয় নয়। শেষ ভরসা ছিল ছাত্রশিবির। রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তির উর্ধে থেকে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার কারণে শিবির ভিন্ন মতের আলেম সমাজ এবং সুধীদের আশীর্বাদ নিয়ে দ্রুত গতিতে সাধারণ ছাত্রদের মন জয় করছিল। এখন শিবির এর স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে জামাতের সাথে একীভূত হয়ে যাবে। হাজারো কথা আসবে, অসংখ্য দায় এর মাথার উপর এসে পড়বে। একটা সম্ভাবনাময় আন্দোলনকে অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়া হলো। এর কারণ কি ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, গোষ্ঠী-স্বার্থ, একগুঁয়েমি, না কি অদূরদর্শিতা আমি জানি না। বাংলাদেশের মানুষের সামনে ইসলামের সঠিক পরিচয় তুলে ধরার মাধ্যমে একটি কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা যাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য তারা এ ভাবে নিজের পায়ে কুড়াল মারতে পারে না। ইসলামী আন্দোলনের ভবিষ্যত পরিণতি ভেবে আমি শঙ্কিত হয়ে পড়লাম।
আমার নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত ছিল, আমি জামাতে ইসলামীতে যোগ দেবো না। যাদের মুখের ভাষা এবং বুকের ভাষা এক নয় তাদের সাথে জীবন বাজি রেখে কাজ করা সম্ভব নয়। তবে এ ব্যাপারে আমি কাউকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করিনি। নিজের কথাও নিজের মধ্যেই গোপন রেখেছি। অন্যদের বলেছি, আপনাদের মধ্যে সাহস, যোগ্যতা এবং উদ্দীপনা থাকলে নতুন কিছু করুন। তবে নিছক আল্লাহকে খুশি করার জন্যে, বাংলাদেশের মানুষের জন্যে এবং মানুষকে সাথে নিয়ে কাজ করতে হবে। যদি বিকল্প ভালো কিছু করতে পারেন আমার সমর্থন এবং সহযোগিতা পাবেন। কিন্তু উদ্যোগ বা নেতৃত্ব – কোন কিছুতে আমাকে পাবেন না। কারণ আমার মধ্যে সে সামর্থ্য বা উদ্দীপনা নেই। আমি এটাও বলেছি, গণ-সংগঠন না করে যুব সংগঠন করা ভালো। আর ‘যুব শিবির’ নামটা শুনতে চমৎকার শোনায়।
এখানে জেনে রাখা ভালো, শিবিরের তৎকালীন সদস্য-কর্মী বা সাধারণ জনশক্তির সাথে এ সব বিষয়ে আমি ইচ্ছে করেই কোন আলাপ করিনি। কাউকে কোথাও যাওয়ার জন্যে ডাক দিলে নিজেকেও এগিয়ে যেতে হবে। নিজে ঘরে বসে থেকে মানুষকে রাস্তায় নামার জন্যে বলা অর্থহীন। এ কারণেই যুব শিবির গঠনের পর আমি কোন দায়িত্ব গ্রহণ করতে সম্মত হইনি। সে সময় সদস্য-কর্মীদের অনেকে আমার সাথে যোগাযোগ করেছেন। ঢাকার বাইর থেকে কেউ কেউ চিঠি লেখে আমার অভিমত জানতে চেয়েছেন। যেখানে কথা বলতে বাধ্য হয়েছি সেখানে বলেছি, ‘আপনার কবরে আপনি একা যাবেন। সুতরাং সিদ্ধান্ত আপনাকেই নিতে হবে। তবে যুব শিবিরের প্রতি আমার সমর্থন রয়েছে।’
তখনও ঢাকায় আছি। একদিন ফোন করলেন শিবিরের প্রাক্তন কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা আবু তাহের। বললেন, আমার সাথে তার জরুরী কথা আছে। গেলাম তার অফিসে। বললেন, ‘শোনলাম আপনারা যুব সংগঠন করছেন। এটা কি ঠিক?’
বললাম, ‘আমি করছি না। তবে কেউ কেউ করার কথা ভাবছেন। এটা তো নতুন কোন চিন্তা নয়। আপনি যখন সভাপতি ছিলেন তখন আপনার সভাপতিত্বে বিষয়টা নিয়ে পরিষদে আলোচনা হয়েছে এবং তাতে আপনারও সমর্থন ছিল।’
বললেন, ‘সে সময়ের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। বর্তমান সময়ে এটা করা ঠিক নয়। পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে পরে করা যেতে পারে।’
বললাম, ‘যারা যুব সংগঠন করার কথা এখন ভাবছেন, তাদের মতে এখন এর জন্যে চমৎকার সময়।’
বললেন, ‘ঠিক আছে, আমার কথা আমি বললাম। বাকি আপনাদের ইচ্ছা।’
আরেক দিন প্রাক্তন সভাপতি আবু নাসের আব্দুজ জাহের ফোন করলেন। খাওয়ার দাওয়াত দিলেন। আরো দুয়েক জন ছিলেন। খাওয়া দাওয়ার পর বললেন, ‘তোমাকে জামাতে ইসলামীতে যোগ দিতে হবে।’ বললাম, ‘আমি এ মুহুর্তে জামাতে যোগ দেয়ার কথা ভাবছি না।’ বললেন, ‘যোগ দেবার এখনই উপযুক্ত সময়। আজই যোগ দাও।’ বললাম, ‘আজ-কাল তো নয়-ই। কখনো যদি যোগ দেয়ার কথা ভাবি তা হলে আপনাকে বলবো।’ আমার এ জবাবে তিনি একটু আবেগ তাড়িত হয়ে পড়েন। অনেক কথা বলার পর বললেন, ‘কোন দিন যদি তোমার জামাতে যোগ দেয়ার ইচ্ছ হয় তবে আমাকে অবশ্যই বলবে। মৃত্যু শয্যায় থাকলেও তোমার সাথে আমি যাবো।’
বেশ কয়েক দিন পর ফোন করলেন ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক লস্কর। খাওয়ার দাওয়াত দিলেন। ইসলামী ব্যাংক নিয়ে তার অনেক আশা এবং স্বপ্নের কথা বললেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘ছাত্রত্ব তো শেষ। এখন কি করবেন?’ বললাম, ‘সিলেট চলে যাব। সেখানে গিয়ে কি করবো এখনো জানি না।’ বললেন, ‘ইসলামী ব্যাংকে অনেক সম্ভাবনা আছে। আমরা একজন কোম্পানী সেক্রেটারী খুঁজছি। যাকে নিয়োগ করবো তাকে ভালো ইংরেজী জানতে হবে। আমরা তাকে বিদেশ পাঠাবো ট্রেনিং নিতে। আপনি তো ইংরেজীতে অনার্স এবং মাস্টার্স করেছেন। ভালো মনে করলে আমাকে বলবেন। আমি দেখবো আপনার জন্যে কি করা যায়।’ জবাবে আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, প্রয়োজন হলে পরে আপনার সাথে এ ব্যাপারে কথা বলবো।’
অপর একদিন ফোন করলেন, অধ্যাপক ফজলুর রহমান, তখন তিনি সিলেট জেলা জামাতের আমীর। বললেন, আপনার সাথে জরুরী কথা আছে। সময় দিলাম। তিনি আজিমপুরে আমার বাসায় এলেন। অনেক কথা হলো। আমি যখন সিলেটের দায়িত্বশীল তখনো তিনি সিলেটে জামাতের দায়িত্বশীল। তার বাসায় ছাত্রশিবির নিয়মিত প্রোগ্রাম করেছি। তাঁর স্ত্রী খায়রুন্নেসা ভাবী আমাকে খুব আদর-কদর করেন। আমার বিয়ের ঘটকালিও তিনি করেছেন।
অধ্যাপক ফজলুর রহমান আমার ভবিষ্যত পরিকল্পণার কথা জানতে চাইলেন। বললাম, ঢাকায় একটা চাকরির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আমি সিলেটে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী। খুব উৎসাহিত হয়ে বললেন, ‘খুব খুশির কথা যে আপনি সিলেট যাওয়ার বিষয় বিবেচনা করছেন। আপনি সিলেট চলে আসুন, আপনাকে শাহ জালাল জামেয়ার প্রিন্সিপাল বানাবো।’
বলালাম, ‘আপনি পারবেন না। ফরীদ উদ্দীন চৌধুরী এর প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল। তাকে সরাতে পারবেন না।’
বললেন, ‘এখন আপনাকে প্রিন্সিপাল নয়, ভাইস প্রিন্সিপাল করবো। ফরীদ চৌধুরকে সংগঠনের জন্যে প্রয়োজন। তাই আমরা যোগ্য ভাইস প্রিন্সিপাল খুঁজছি। সেই ভাইস প্রিন্সিপালের উপরই পরে প্রিন্সিপালের দায়িত্ব দেবো। ’
বললাম, ‘ঠিক আছে। আগে সিলেট আসি, তারপর দেখা যাবে। ’

শিবিরের ক্রান্তিকালঃ১৯৮২ সালের কথকতা-৪

পরিস্থিতি বোঝার জন্যে ঢাকা শহরে যারা অনাস্থাপত্র পাঠিয়েছে তাদের কয়েকজনকে আমি ডেকে আনলাম। পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করলাম। জিজ্ঞাস করলাম, কি ব্যাপার? হঠাৎ করে গোটা দেশের সদস্যরা এমন সংগঠন-সচেতন হয়ে উঠলো কেন? কেউ কেউ মিউ মিউ করে জবাব দিলেন। কেউ এড়িয়ে গেলেন। সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের অনেক কথা বলার পর বললেন, ‘আমি শাহজাহান চৌধুরীর চিঠি পেয়ে মতিউর রহমান নিজামীর সাথে আলাপ করেছি। তিনি যে ভাবে জবাব দিয়েছেন এতে বুঝেছি এ ব্যাপারে তার সম্মতি রয়েছে। এ কারণেই আমি এর সাথে জড়িত হয়েছি।’ বিশ্বস্ত সূত্রে আরো খবর পেলাম, শাহ জাহান চৌধুরীর চিঠি নিয়ে ছাত্রশিবিরের কিছু বর্তমান এবং প্রাক্তন সদস্য বিভিন্ন শহরে গিয়ে দ্রুত অনাস্থা প্রস্তাব প্রেরণের জন্যে শিবিরের সদস্যদের তাগিদ দিয়েছেন। যারা গিয়েছেন তাদের অনেকের নাম জেনে বিস্মিত হয়েছি। কারণ আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের সাথে আমার ঘনিষ্টতা ছিল। অনেককে আমি নিজ হাতে গড়েছি।
ঘটনার আকস্মিতা এবং জটিলতা ব্যক্তিগত ভাবে আমাকে মানসিক ভাবে অত্যন্ত বিপর্যস্থ করে তুলে। ধীর-স্থির ভাবে ঘটনবলীর বিশ্লেষণ করে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্যে মানসিক যে শক্তির প্রয়োজন তা মোটেই পাচ্ছিলাম না। কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং ঢাকায় অবস্থানরত পরিষদ সদস্য জসীম উদ্দীন সরকার, মাসুদ মজুমদার, আশেক আহমদ জেবাল, আনোয়ার হোসেন প্রমুখের সাথে কথা হচ্ছিল। তাদের কথা শুনছিলাম, কিন্তু কাউকে কোন পরামর্শ দেয়ার মতো মনের জোর ছিল না। সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সভাপতি কার্যকরী পরিষদের জরুরী বৈঠক আহ্বান করলেন। বৈঠকের দিন দেখলাম সাংগঠনিক কাজে বিদেশে অবস্থানরত পরিষদ সদস্য নজরুল ইসলাম খাদেম বিদেশ থেকে তড়িঘড়ি করে ফিরে এসে বৈঠকে হাজির হয়েছেন।
বৈঠক শুরুর পরই সকলের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম বললেন, ‘বর্তমান জটিল অবস্থার সমাধান করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সমস্যা সমাধানের সকল দায়িত্ব আমীরে জামাতের উপর ছেড়ে দেয়া হোক।’ মুজাহিদুল ইসলামের প্রস্তাব শুনে আমি বিস্মিত হলাম। তিনি জানেন, ঘটনার সাথে জামাতের কেউ কেউ জড়িত আছেন। আমীরে জামাতের সম্মতি ছাড়া জামাতে ইসলামীর নেতা বা সদস্য এ রকম একটা অসাংগঠনিক কাজে জড়িত হবে তা ভাবা যায় না। পরে ভেবেছি, মুজাহিদুল ইসলাম হয়তো মনে করেছেন, আমীরে জামাত খালেস-মুখলিস মানুষ। তাঁকে অন্ধকারে রেখে বা ভুল বুঝিয়ে জামাতের দ্বিতীয় সারির নেতৃবৃন্দ এ কাজটি সম্পন্ন করেছেন। তিনি মনে করেছেন, সকল কথা শোনার পর আমীরে জামাতের ভুল ধারণা দূর হবে এবং তিনি দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
আমার ব্যক্তিগত চিন্তা ছিল, প্রথমে আমরা সংগঠনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কারণে শাহ জাহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেব। তারপর শিবিরের বর্তমান এবং প্রাক্তন সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটা শক্তিশালী কমিটির উপর পুরো ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব অর্পন করবো। কিন্তু মুজাহিদুল ইসলামের প্রস্তাব শোনার পর কতিপয় পরিষদ সদস্য খুব উৎসাহ নিয়ে তা সমর্থন করে বসলেন। কেন্দ্রীয় সভাপতিও এ ব্যাপারে ইতিবাচক কথা বললেন। সদস্যদের মনোভাব প্রত্যক্ষ করে আমি আমার প্রস্তাব উত্থাপন করা থেকে বিরত থাকলাম। ভাবলাম, আমার প্রস্তাব শুনে কেউ ভাবতে পারে যে আমি আমীরে জামাতের উপর অনাস্থা প্রকাশ করছি। তাই সর্বসম্মত ভাবে মুজাহিদুল ইসলামের প্রস্তাব পাশ হয়ে গেলো। আমীরে জামাতকে ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করা এবং তাঁকে পরিষদের প্রস্তাব পৌছে দেয়ার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সভাপতি আহমদ আব্দুল কাদের এবং সেক্রেটারী জেনারেল হিসেবে আমার উপর প্রদান করা হলো।
যতটুকু মনে পড়ে পরদিনই আমরা অধ্যাপক গোলাম আযমের সাথে দেখা করতে যাই। তাঁর সাথে প্রায় ঘন্টা দুয়েক আলাপ হয়। প্রথমেই তিনি বললেন, ‘ঘটনা শোনার পর আমি অস্থির হয়ে পড়েছি।’ তাঁর সাথে মূলতঃ কেন্দ্রীয় সভাপতিই কথা বললেন। আমি শুধু এটা ওটা যোগ করলাম। ঘটনার সাথে জামাতের লোকদের জড়িত থাকার কথা আমরা জোর দিয়ে বললাম। আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের আমাকে নিজামী সাহেব সম্পর্কে যে কথা বলেছিলেন তাও বললাম। তিনি অখন্ড মনযোগ দিয়ে আমাদের কথা শুনলেন। তারপর বললেন, ‘তোমরা যখন বলছো, আমি বিষয়টার দায়িত্ব গ্রহণ করলাম। দেরি না করে এখনই কাজ শুরু করে দেবো। অনেকের সাথে আলাপ করতে হবে। তোমাদের সাথেও আরো আলাপ হবে।’
আমরা সন্তুষ্ট চিত্তে তাঁর বাসা থেকে ফিরে এলাম।
কয়েকদিন পর প্রফেসার সাহেব আমাকে যাওয়ার জন্যে খবর দিলেন। যথাসময়ে আমি গেলাম। কিছু খুচরা আলাপের পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ ঘটনার আসল কারণ কি?’
আমি বললাম, ‘আমার মতে আমি সেক্রেটারী জেনারেল হওয়ার কারণেই এমনটি ঘটেছে। কিছু লোক চায়নি আমি সেক্রেটারী জেনারেল হই।’
তিনি বললেন, ‘তোমার হওয়ার কারণে জটিলতা সৃষ্টি হয়নি। মিলন না হওয়ার কারণে হয়েছে।’
আমি বললাম, ‘কথা তো একটা-ই।’
তিনি বললেন, ‘আর কি কারণ থাকতে পারে?’
আমি বললাম, ‘আমি আর কোন কারণ জানি না। শাহ জাহান চৌধুরী যা বলেছে তাতে সত্যের লেশমাত্র নেই। মানুষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি থাকতে পারে। তা দূর করার পথও আছে। কিন্তু যা করা হয়েছে তা জঘন্য।’
তিনি বললেন, ‘আমি তা দেখবো।’
প্রায় ঘন্টা খানেক তার সাথে আরো নানা কথা হলো। কথায় কথায় আমাকে বললেন, ‘আগে তোমাকে নিয়ে আমার সুনামগঞ্জ কেন্দ্রিক চিন্তা ছিল। সেক্রেটারী জেনারেল হওয়ার পর তোমাকে নিয়ে ঢাকা কেন্দ্রিক চিন্তা শুরু করেছি।’
সব শেষে বললেন, ‘আব্দুল্লাহ তাহেরের বরাতে তুমি যে কথা বলেছিলে তা আমি নিজামী সাহেবকে জিজ্ঞেস করেছি। তিনি বলেছেন তাহেরকে তিনি এ ধরণের কোন কথা বলেননি।’
প্রফেসার সাহেবের নিকট থেকে ফিরে আসার পর শুরু হলো অপেক্ষার পালা। অপর দিকে নানা রকম গুজব এবং কানাকানির খবরও কানে আসতে লাগলো। মাওলানা আব্দুল জাব্বারের কথা শুনলাম। জামাতের কর্ম পরিষদের সিদ্ধান্তের কথা শুনলাম। আমি কখনো এ সকল কথা যাচাই করার জন্যে মাওলানা আব্দুল জাব্বারের সাথে দেখা করতে যাইনি। আহমদ আব্দুল কাদেরকে তিনি বলেছেন। অবশ্য সকল কানাকানির খবর আমার কানে আসতো না। শিবিরের কলাবাগানের মেস ছেড়ে আমি চলে এসেছিলাম। তখন আমি থাকতাম আজিমপুরে, ঢাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বন্ধুবর হাফিজ আব্দুশ শাকুরের বাসায়। আলু বাজার মেস বা কলাবাগান মেসে গেলে খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্যে সদস্য-কর্মীদের সাথে দেখা হতো।
ঢাকা, সিলেট, কুমিল্লা এবং চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনের কারণে এ সকল এলাকার সদস্যদের অনেকে আমার সাথে ব্যক্তিগত ভাবে কথা বলতে চেয়েছেন। অনেকে আমার সাথে কথা বলার জন্যে আজিম পুরে পর্যন্ত এসেছেন। অনেকে আমাকে এ বলে অভিযুক্ত করেছে যে, কতকিছু ঘটে যাচ্ছে, কিন্তু এখনো আমি মুখ খুলছি না কেন? সেই ক্রান্তিলগ্নেও কারো সাথে আমি অসাংগঠনিক কোন কথা বলিনি, আমার বলার ইচ্ছে হয়নি। একজন শাহ জাহান চৌধুরীর কারণে সাংগঠনিক শৃঙ্খলায় অভ্যস্থ ফরীদ আহমদ রেজা তার শৃঙ্খলা ভঙ্গ করতে পারে না। তাই আমার কথাবার্তা যা হয়েছে কার্যকরী পরিষদ সদস্যদের সাথে।
একদিন পরিষদ সদস্য আনোয়ার হোসেন, যিনি ঢাকা শহরে আমার সেক্রেটারী ছিলেন, আমাকে বললেন, ‘এটা আপনারা কি করলেন? সকল দায়িত্ব আমীরে জামাতের হাতে তুলে দিলেন? তিনি কি কিছু করতে পারবেন?’ আমি বললাম, ‘দেখা যাক কি হয়?’ তিনি বললেন, ‘এক কাজ করেন। প্রফেসার সাব, আপনি আর আহমদ আব্দুল কাদের, এ তিন জন মিলে একটা দল গঠন করেন। তা হলে জমবে ভালো।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘এ কথার মানে কি? কি জন্যে এ কথা বলছেন?’ জবাবে তিনি বললেন, ‘আপনারা তিনজনই খুব সহজ সরল। পৃথিবী এ রকম নয়।’
দীর্ঘ অপেক্ষার পর সে দিন এলো যে দিন প্রফেসার সাহেব তার রায় ঘোষণা করবেন বলে ঠিক হয়েছিল। আমরা পরিষদ সদস্যরা ইবনে সিনা ক্লিনিকের একটি কামরায় জড়ো হলাম। কে একজন আমাকে বললেন, সম্ভবতঃ আলী আহসান মুজাহিদ, ‘যেহেতু কেন্দ্রেীয় সভাপতির উপর অনাস্থা তাই আজকের বৈঠক আপনার সভাপতিত্বে হওয়া দরকার।’ কেন্দ্রীয় সভাপতিও আমাকে বললেন, ‘ঠিক আছে, আপনি-ই সভা পরিচালনা করুন।’
চূড়ান্ত রায় ঘোষণার আগে প্রফেসার সাহেব আমার সাথে একান্তে কিছু কথা বলতে চাইলেন। আমরা দু জন একটা কামরায় গিয়ে বসলাম। তিনি বললেন, ‘আমি তোমাকে কয়েকটি কথা জিজ্ঞেস করতে চাই;
শুনলাম তোমরা নাকি ৭১এর পর্যালোচনা করতে চাও। এটা কি ঠিক?
আমি বললাম, ‘ঠিক। আমরা জানতে চাই কোন পরিস্থিতিতে এবং কেন জামাত ৭১ সালে পাকিস্তানীসামরিক বাহিনীর সাথে সহযোগিতার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।’
– এটা কে করবে?
– করবেন আপনারা, যারা সিদ্ধান্তের সাথে জড়িত ছিলেন। আমরাও থাকবো। তবে পূর্বাপর ঘটনাবলীর ব্যাখ্যা আপনাদের দিতে হবে। আমরা তো তখন ছিলাম না। তাই অনেক কিছু আমাদের সরাসরি জানা নেই। আমরা জানতে চাই ৭১ সালে কেন পাকিস্তানী মিলিটারীদের সহযোগিতা করা হয়েছে? কেন এবং কোথায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে? এর ফলে কী লাভ-ক্ষতি হয়েছে? এ সকল বিষয় পর্যালোচনা করে এ ব্যাপারে জনশক্তি এবং জনগণকে অবহিত করতে হবে।
– জামাত যদি এ পর্যালোচনায় শরিক থাকে তা হলে তো খারাপ কিছু নয়।
আচ্ছা বলতো, তোমরা যুব সংগঠন কেন করতে চাও?
– যুব সংগঠন করতে চাই প্রাক্তন শিবির কর্মীদের ইসলামী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত করার জন্যে। কারণ ছাত্র জীবন শেষ হবার পর তারা অনেকে হারিয়ে যাচ্ছে। তবে এ সেশনে আমরা তা নিয়ে আলোচনা করিনি। কয়েক বছর আগে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল এবং আলী আহসান মুজাহিদ তখন এ ব্যাপারে খুব উৎসাহ দেখিয়েছেন।
– এটা কে করবে?
– সাবেক শিবির-সদস্যরা তা করবেন। জামাতকেও সহযোগিতা করতে হবে।
– এটাও খুব ভালো জিনিস।
আরেকটা প্রশ্ন। বলতো, শিবিরের সংবিধানে সেক্রেটারী জেনারেল নিয়োগের ধারায় সংশোধন না আনলেই কি নয়? এটা না করলে চলে না?
– প্র্যাকটিস এবং ব্যাখ্যার মধ্যে পরিবর্তন হলে যে ভাষায় তা লেখা আছে তাতেই চলবে। একজন সংশোধনী প্রস্তাব এনেছিলেন। পরে তিনি এটা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। সাংগঠনিক সেশনের শেষের দিকে তা আবার আসতে পারে। আপনি বললে সংশোধনী প্রস্তাব যাতে না আসে, আমি সে চেষ্টা করবো।
এ যদি হয় তা হলে আহমদ আব্দুল কাদের সভাপতি থাকতে পারে। তোমরাও থাকতে পারো। ঠিক আছে, আমি নিজামী সাহেবের সাথে একটু আলাপ করে নেই। এ কথা বলে প্রফেসার সাহেব অন্য কামরায় উঠে গেলেন যেখানে মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ প্রমুখ বসা ছিলেন।
কিছুক্ষণ পর আলী আহসান মুজাহিদ এসে বললেন, ‘প্রফেসার সাহেব আপনাকে যে কথা বলেছেন তা এখন সম্ভব নয়। যে ভাবে বিষয়টার সমাধান হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে সে ভাবেই হবে, এখন এতে কোন পরিবর্তন করা যাবে না।’ প্রফেসার সাহেবের প্রশ্ন থেকে আমি বুঝতে পারলাম আমাদের বিরুদ্ধে কি কথা বলে তাঁকে প্রভাবিত করা হয়েছে। অপরদিকে আলী আহসান মুজাহিদের কথা থেকে আমার কাছে পরিস্কার হয়ে গেলো কি ফায়সালা আসছে এবং এ ফায়সালা কারা তৈরি করেছেন।

বিরাশি সালের কথকতা-3

ঢাকার কলাবাগানে অবস্থিত শিবিরের মেসে আমার থাকার ব্যবস্থা হলো। ছাত্রত্ব বজায় রাখার জন্যে ঢাকা ল কলেজে আইন পড়তে ভর্তি হলাম। নির্বাচন হলো এবং আমাকে ঢাকা শহরের সভাপতি নির্বাচিত করা হলো। ঢাকা শহরের অধিকাংশ সদস্যের পরামর্শের আলোকে সেক্রেটারী নিয়োগ করলাম কার্যকরী পরিষদের নতুন সদস্য আনোয়ার হোসেনকে। অত্যন্ত কর্মঠ, বুদ্ধিমান, অভিজ্ঞ এবং বিশ্বস্ত একজন ব্যক্তিকে সেক্রেটারী হিসেবে পেয়ে খুব ভালো লাগলো।
শিবিরের দুই সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ৮২ সালে কর্মপরিষদ সদস্য (ছবি: গুগুল থেকে নেয়া)
কর্মপরিষদে পেলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজের সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, সলিমুল্লাহ মেডিকেলের আমিনুল ইসলাম মুকুল, কলেজসমূহের ইনচার্জ আব্দুল হক এবং অন্যান্য জোনের দায়িত্বশীলদের। তাদের সহযোগিতা, আন্তরিকতা এবং যোগ্যতা প্রশ্নের উর্ধে ছিল। আমি নিশ্চিত ছিলাম, ছয় মাস পর আমি চলে গেলে এরা যে কেউ যোগ্যতার সাথে ঢাকা শহর পরিচালনা করতে পারবেন। বার্ষিক পরিকল্পণা গ্রহণ করলাম। সকল থানা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সফর করলাম। নতুন উদ্যমে কাজ শুরু হলো। কিন্তু কি জানতো আমার জন্যে আরো কিছু বিস্ময়কর ঘটনা অপেক্ষা করছে।
একদিন আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ আমাকে ডেকে পাঠালেন। ভূমিকা হিসেবে অনেক কথা বলার পর শেষে বললেন, ‘এনামুল হক মনজু ব্যক্তিগত কারণে কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করবেন। আমি যেন ঢাকায় অবস্থানরত পরিষদ সদস্যদের সাথে আলাপ করে তাদের মানসিক ভাবে প্রস্তুত করি। এর কোন বিকল্প নেই। দ্রুত এর ব্যবস্থা করুন।’ আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে ঢাকার পরিষদ সদস্যদের ডাকলাম। বিষয়টা ব্যাখ্যা করলাম। তারা সবাই কারণ জানতে চাইলেন। আমি বললাম, ‘কারণ ব্যক্তিগত। এর চেয়ে বেশি কিছু আমি বলতে পারবো না।’ তারা অনেক চাপাচাপি করলেন। বললেন, ‘কেন্দ্রীয় সভাপতি ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করতে চাইলে করবেন। আমরা কারণ জানতে চাই এ জন্যে যে তা হলে হয়তো কারণ দূর করার একটা পথ আমরা খুঁজে পেতে পারি।’ আমি বললাম, ‘প্রয়োজন হলে আপনারা পরিষদের বৈঠকে তাকে কারণ জিজ্ঞেস করবেন। তবে আমার অনুরোধ, বৈঠকে আপনারা পদত্যাগের কারণ জানতে বা তা প্রত্যাহার করার জন্যে বেশি চাপাচাপি করবেন না।’ দুয়েক দিনের মধ্যে পরিষদের বৈঠক ডাকা হলো। বৈঠকে এনামুল হক মনজু পদত্যাগ করলেন। উপস্থিত সদস্যরা আমার অনুরোধ আমলে না নিয়ে কারণ জানতে এবং পদত্যাগ না করতে অনেক অনুরোধ করলেন। কিন্ত এনামুল হক মনজু তার সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন।
কেন্দ্রীয় সভাপতি পদত্যাগের পর সংবিধান অনুযায়ী পরিষদের সদস্যদের ভোটে আহমদ আব্দুল কাদেরকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। এ বৈঠকেই পরবর্তী কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত মোতাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচন সম্পন্ন হয় এবং সারা দেশের সদস্যদের ভোটে আহমদ আব্দুল কাদের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন।
আহমেদ আব্দুল কাদের বাচ্চু, সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি (ছবি উৎস: গুগুল)
আহমদ আব্দুল কাদের, সাবেক সভাপতি, ছাত্র শিবির তখন ও এখন (ছবি: গুগুল থেকে নেয়া)
আহমদ আব্দুল কাদের সেক্রেটারী জেনারেল নিয়োগের জন্যে পরিষদের সদস্যদের সাথে পরামর্শ শুরু করলেন। আমি তাকে প্রস্তাব দিলাম, ‘আপনি সাইফুল আলম খান মিলনকে সেক্রেটারী জেনারেল হিসেবে রাখুন। মেয়াদ শেষ হবার আগে তাঁকে বাদ দেয়া ভালো দেখায় না’ তিনি বললেন, ‘আপনার পরামর্শ শুনলাম। তবে অধিকাংশ পরিষদ সদস্য যার পক্ষে মতামত দিবেন তাকেই আমি সেক্রেটারী জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দিতে চাই।’ আমি বললাম, ‘আর যা-ই করুন, আমাকে সেক্রেটারী জেনারেল করবেন না। আমার ছয় মাসের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এখন ঢাকা শহরের জন্য নতুন সভাপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা করে আমাকে বিদায় দেন।’ তিনি বললেন, ‘দেখা যাক পরিষদ সদস্যরা কি বলেন।’
এক সময় পরিষদের বৈঠক শুরু হলো। প্রথম এজেন্ডা সেক্রেটারী জেনারেল নিয়োগ। আহমদ আব্দুল কাদের বৈঠক শুরু করেই বললেন, ‘আমি অধিকাংশ পরিষদ সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে সেক্রেটারী জেনারেল হিসেবে ফরীদ আহমদ রেজার নাম ঘোষণা করছি।’ ঘোষণা শুনে আমি থ হয়ে গেলাম। আমার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হলো না। অন্যরা আলহামদুলিল্লাহ বলে ঘোষণাকে স্বাগত জানালেন। বৈঠকে ঠিক আমার পাশে বসেছিলেন সাইফুল আলম খান মিলন। চেয়ে দেখলাম তার ফর্সামুখ, হয়তো রাগে-দুঃখে, লাল হয়ে গেছে। পরক্ষণেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং কাউকে কিছু না বলে ঝড়ের বেগে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। সবাই সেটা দেখেও না দেখার ভান করলেন। কেন্দ্রীয় সভাপতি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকলেন। তারপর পরিষদের বৈঠক সেখানেই মুলতবী ঘোষণা করলেন।
সাইফুল আলম খান মিলন, সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি (ছবি উৎস: ছাত্র শিবির ওয়েবসাইট)
পরে এক সময় আমি ফোন করলাম সাইফুল আলম খান মিলনকে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি যে ভাবে রাগ করে এবং কাউকে কিছু না বলে পরিষদের বৈঠক থেকে বেরিয়ে গেলেন, তা কি ঠিক হয়েছে?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘না ঠিক হয়নি। কিন্তু আমি সহ্য করতে পারিনি। এ জন্যে বেরিয়ে গেছি।’
৮২ তে ফরিদ আহমেদ রেজা
৮২ তে ফরিদ আহমেদ রেজা
পরদিন পরিষদের বৈঠক শুরু হলে সাইফুল আলম খান মিলনের সে দিন বৈঠক থেকে বেরিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে আমি বললাম, ‘আমার সাথে তাঁর আলাপ হয়েছে, তিনি স্বীকার করেছেন এটা ঠিক হয়নি। সুতরাং এ বিষয়ে আর কথা না বাড়ানোই ভালো।’ আমার এ অনুরোধ কারো কারো মনঃপুত না হলেও অধিকাংশ সদস্য মেনে নেন। নির্বাচন এবং দায়িত্ব বন্টন সম্পন্ন হবার পর সংগঠনের নিয়মিত কাজের দিকে আমরা মন দিলাম।
হঠাৎ একদিন কে একজন খবর দিলেন, শাহ জাহান চৌধুরী (মোমেনশাহী) গোটা দেশের সদস্যদের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, শিবিরের বর্তমান নেতৃত্ব সংগঠনের মূল আদর্শ থেকে সরে গেছে। কার্যকরী পরিষদের সদস্যরা ছাত্রজীবন শেষ হবার পরও শিবির ত্যাগ করছে না। তারা ষড়যন্ত্র করে কেন্দ্রীয় সভাপতিকে পদত্যাগে বাধ্য করে নেতৃত্ব দখল করে নিয়েছে। সে চিঠিতে সদস্যদের প্রতি আবেদন জানানো হয়েছে, তারা যেন সংগঠন রক্ষার তাগিদে বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করে। এ চিঠির খবর পাওয়ার সাথে সাথে, আমাদের অবাক করে দিয়ে ঢাকা, সিলেট, চট্রগ্রাম, রাজশাহী প্রভৃতি এলাকা থেকে সদস্যদের দস্তখত সম্বলিত অনাস্থাপত্র আসা শুরু হয়। আমরা বুঝলাম যে একটা সুচিন্তিত পরিকল্পণা, সুসংবদ্ধ জনবল এবং আনুষঙ্গিক উপায় উপকরণ ছাড়া সারা দেশে এত দ্রুততার সাথে চিঠি প্রেরণ এবং অনাস্থা প্রস্তাব আনয়ন সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।
(চলবে)

বিরাশি সালের কথকতা-২

কার্যকরী পরিষদের বৈঠকে ঢাকায় গেলাম। কেন্দ্রিয় সভাপতি বললেন, ‘ঢাকা শহরে যোগ্য লোক নেই। সভাপতি বিদায় নিয়েছেন। সেখানে এখন যারা আছেন, তাদের উপর ভরসা করা যায় না।’ আমি কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে বললাম, ‘তাদের মধ্যে যে কেউ ঢাকা শহরকে যোগ্যতার সাথে পরিচালনা করতে পারবেন। নতুবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অমুক এবং অমুককে নিয়ে আসুন।’ তিনি আমতা আমতা করলেন। বুঝলাম আমি যাদের নাম বলেছি ওরা তাঁর পছন্দের লোক নয়। এ ধরণের সাবজক্টিভ মনোভাব আমার একদম ভালো লাগে না। অনেকক্ষণ আলাপের পরও কোন ফায়সালা হলো না। বিরতি দেয়া হলো।
আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, সাবেক সভাপতি পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘ (ছবি: গুগুল থেকে নেয়া)
আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, সাবেক সভাপতি পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘ (ছবি: গুগুল থেকে নেয়া)
বিরতির সময় আলী আহসান মুজাহিদ এসে বললেন, আপনার সাথে একান্তে কিছু কথা আছে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি কথা?’ তিনি বললেন, ‘আপনাকে ঢাকা শহরে মাত্র ছয়টা মাস সময় দিতে হবে। তারপর আপনার ছুটি। আপনাদের কেন্দ্রীয় সভাপতি অন্য কাউকে ঢাকা শহরে দিয়ে স্বস্তি পাবেন না। আপনি দীর্ঘ দিন সংগঠনের জন্যে কাজ করেছেন, আরো ছয়টা মাস ছাত্রশিবিরে থাকুন।’
আমি বললাম, ‘এটা সম্ভব নয়। আমাকে ছাত্রজীবন শেষ করতে হবে। চট্টগ্রাম শহরের বোঝা আমার ঘাড়ে দেয়া হয়েছিল একটা বিপজ্জনক ক্রান্তি লগ্নে। সেটা যতটুকু পারি বহন করেছি। চট্টগ্রাম শহর এখন নিজে নিজে চলতে পারবে। চট্টলায় যোগ্য লোকের অভাব ছিল না। শুধু ছিল আত্মবিশ্বাসের অভাব। এক বছরে তাদের নিজেদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জন্ম নিয়েছে। চট্টগ্রাম শহরের নির্বাচনের পর-ই আমি সিলেট চলে যাবো। আমার আব্বা-আম্মার বয়স হয়েছে। আমি তাদের বড় ছেলে। আমাকে তাদের দেখতে হবে।’
আমি আরো বললাম, ‘আমার অনার্স পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো হয়নি। আশা ছিল এম এ পরীক্ষায় সেটা পোষিয়ে নেব। কিন্তু আমাকে শান্তিতে এম এ পরীক্ষা দিতে দেয়া হয়নি। আমার মনে আছে, পরীক্ষার এক মাস আগে সাংগঠনিক কাজ থেকে বিদায় নিয়ে দরজা বন্ধ করে পড়তে বসেছি। তখন চট্টগ্রাম শহরের সিনিয়র সদস্যরা একযোগে এসে বলেছেন, হয় সভাপতির পরীক্ষা হবে, নতুবা চট্টগ্রাম কলেজের নির্বাচন হবে। দুটো এক সাথে করা সম্ভব নয়। আপনি ফায়সালা দেন কোনটা হবে। টেবিলের উপর খোলা বই বন্ধ করে বলেছি, এম এ পরীক্ষা হোক বা না হোক, চট্টগ্রাম কলেজের নির্বাচন হবে। এখন থেকে আমার ছুটি বাতিল। এই ভাবে আমি এমএ পরীক্ষা দিয়েছি। এখন এমএ পরীক্ষার ফলাফল যাই হোক, আমি আর ছাত্রশিবিরে নেই।’
তিনি আমার কথার জবাবে অনেক কথা বললেন। সেখানে অনেক অযৌক্তিক এবং আবেগময় কথা ছিল। সব কথার সার কথা, ছ মাসের জন্যে আমাকে ঢাকা শহরে কাজ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত তাঁর কথা ফেলতে পারলাম না। বললাম, ‘ঠিক আছে। মনে থাকে যেন মাত্র ছয় মাস, এ থেকে একদিনও বেশি নয়।’ এ ভাবেই আমাকে চট্টগ্রাম শহর থেকে সিলেটে প্রত্যাবর্তন না করে ঢাকায় আসতে হয়।
একই বৈঠকে আরেকটি ঘটনা ঘটে। ছাত্রশিবিরের সংবিধান অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হবার পর কার্যকরী পরিষদ সদস্যদের সাথে পরামর্শ করে সেক্রেটারী জেনারেল নিয়োগ করেন। এখানে ‘পরামর্শ করে’ কথাটার ভাষাগত অর্থ হচ্ছে পরামর্শ অনুযায়ীএর ব্যবহারিক বা প্রচলিত অর্থ হচ্ছে কেন্দ্রীয় সভাপতি পরামর্শ করবেন, কিন্তু তাদের অধিকাংশের পরামর্শ গ্রহণ করা তাঁর জন্যে বাধ্যতামূলক নয়। এই প্রচলিত ব্যাখ্যা সেই শুরু থেকে আমরা শুনে আসছি এবং কেউ এটাকে চ্যালেঞ্জ করেনি বা এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে আলোচনা হয়নি। কিন্তু আমাদের অনেকের পর্যবেক্ষণ ছিল, যে ভাবে সাংবিধানিক এ সুযোগকে ব্যবহার করা হচ্ছে তা নানা কারণে সঠিক হচ্ছে না।
ছবি উৎস: ছাত্র শিবির ওয়েবসাইট
ছবি উৎস: ছাত্র শিবির ওয়েবসাইট
এনামুল হক মনজু কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হবার পর প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তিনি পরিষদের সদস্যদের সাথে পরামর্শ করেন এবং সাইফুল আলম মিলনকে সেক্রেটারী জেনারেল নিয়োগ করেন। এটা অনেকের কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। ইতোপূর্বে যারা সেক্রেটারী জেনারেল হয়েছেন তারা এক, দুই বা তিন নম্বর চয়েসের মধ্যে ছিলেন। কিন্তু সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার বিচারে সাইফুল আলম মিলনের অবস্থান ছিল অনেক পেছনে। প্রশ্ন জেগেছে, কেন তাকে সেক্রেটারী জেনারেল করা হলো? কয়েক বছর থেকে দেখা যাচ্ছে, যিনি সেক্রেটারী জেনারেল নিযুক্ত হন পরবর্তীতে তিনি কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। তা হলে কি পর্দার অন্তরালে থেকে কেউ নিজেদের পছন্দমত কেন্দ্রীয় সভাপতি বাছাইয়ের কাজ সম্পন্ন করছে?
এর একটা জবাব আমার কাছে ছিল, যদিও সে সময় আমি কাউকে তা বলিনি। এনামুল হক মনজু কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হবার পর কাকে সেক্রেটারী জেনারেল করা যায় তা নিয়ে আমি সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের সাথে পরামর্শ করতে চেয়েছি। তিনি প্রথমে আমাকে কিছু বলতে চাননি। অনেক চাপাচাপি করার পর বলেছেন, ‘এটা আপনাদের ব্যাপার। যাকে ইচ্ছা আপনি প্রস্তাব করতে পারেন।’
শহীদ কামারুজ্জামান, সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি (ছবি উৎস: ছাত্র শিবির ওয়েবসাইট)
শহীদ কামারুজ্জামান, সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি (ছবি উৎস: ছাত্র শিবির ওয়েবসাইট)
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘অমুক বা অমুক হলে কেমন হয়?’
তিনি বললেন, ‘বাইরে আছেন এমন কাউকে নিয়ে চিন্তা করুন।’
আমি বললাম, ‘কে এমন যোগ্য লোক যিনি বাইরে আছেন?’
তিনি বললেন, ‘কেন, সাইফুল আলম খান মিলন বাইরে আছেন।’
উল্লেখ্য যে তখন সাইফুল আলম খানকে সংগঠনের পক্ষ থেকে হজ্বে পাঠানো হয়েছিল।
আমি বললাম, ‘এটা হয় না। তার চেয়ে অনেক অভিজ্ঞ ও যোগ্য লোক আছেন।’ আমার জবাব শুনে তিনি কোন মন্তব্য করেননি। তার সাথে কথা আর এগোয়নি।
পরে যখন সাইফুল আলম খান মিলনকে সেক্রেটারী জেনারেল করা হলো, আমি বুঝলাম তিনি প্রাক্তন সভাপতিদের বাছাইকৃত ব্যক্তি। এ ঘটনা পরিষদ সদস্যদের মধ্যে সংবিধানের এ ধারা পূনর্বিবেচনার চিন্তা জাগ্রত করে। মনে হয় এ কারণেই পরিষদের পরবর্তী বৈঠকে সেক্রেটারী জেনারেল নিয়োগের এ ধারা সংশোধনের প্রস্তাব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি আশেক আহমদ জেবাল উত্থাপন করেন। ‘মনে হয়’ এ জন্যে বলছি, আশেক আহমদ জেবালের সাথে এ নিয়ে আমার কোন আলাপ হয়নি। যদিও প্রচারণা রয়েছে, আমরা সবাই মিলে এ সংশোধনী এনেছি। তার সংশোধিত প্রস্তাব ছিল, কেন্দ্রীয় সভাপতি পরিষদের অধিকাংশ সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে সেক্রেটারী জেনারেল নিয়োগ করবেন।
প্রস্তাবিত সংশোধনী উত্থাপিত হবার পর দেখা গেলো দুয়েকজন ছাড়া পরিষদের আর সবাই সংশোধীনর পক্ষে মতামত রাখছেন। প্রাক্তন সভাপতি হিসেবে আলী আহসান মুজাহিদ সে বৈঠকে ছিলেন। তিনি এবং কেন্দ্রীয় সভাপতি বার কয়েক প্রচলিত ধারার পক্ষে বক্তব্য রাখার পরও দেখা গেল অধিকাংশ পরিষদ সদস্য সংশোধনীর পক্ষে রয়েছেন। তখন কেন্দ্রীয় সভাপতি বৈঠক মূলতবী করে দেন। তারপর একান্তে মন্তব্য করেন, যদি এ সংশোধনী পাশ হয় তা হলে তার পক্ষে দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়।
বিরতির সময় আবার আলী আহসান মুজাহিদ আমাকে ডাকলেন। বললেন, ‘সংশোধনী পাশ হলে এনামুল হক মনজু পদত্যাগ করবেন। এটা কি ভালো হবে?’ আমি বললাম, ‘না এটা ভালো হবে না। আপনি এনামুল হক মনজুকে বোঝান, অধিকাংশ সদস্যের মতামত মেনে নেয়ার জন্যে।’ তিনি বললেন, ‘বুঝিয়ে লাভ হবে না। আপনি একটা পথ খুঁজে বের করুন।’ আমি বললাম, ‘সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী সভাপতি অধিকাংশের মত মেনে নেবেন। এটাই তো বিধান।’ তিনি বললেন, ‘তা হবে না।’ তখন আমি বললাম ‘এ অবস্থায় আমি আশেক আহমদ জেবালকে সংশোধনী প্রস্তাব প্রত্যাহার করার জন্যে অনুরোধ করে দেখতে পারি।’ তিনি বললেন, ‘তাই করুন। জেবাল এক সময় আপনার কর্মী ছিলেন, তিনি আপনার কথা শুনবেন।’
সে অনুযায়ী আমি জেবালের সাথে আলাপ করলাম। অচলাবস্থার জটিল প্রকৃতি এবং এর সাংবিধানিক পরিণতি ব্যাখ্যা করে বললাম, ‘আপাততঃ আপনার সংশোধনী প্রত্যাহার করে নেন। প্রয়োজন হলে বছরের শেষের দিকে আবার এ সংশোধনী উত্থাপন করা যাবে।’ জেবাল আমার কথা মেনে নিলেন। আমরা একটা সংকট থেকে রক্ষা পেলাম।

১৯৮২ সালের কথকতা by professor Farid Ahmed Reza

প্রশ্ন উঠতে পারে, এতোদিন পর এ সকল পুরানো কথা আলোচনার কী কোন প্রয়োজন আছে? আমার মতে অন্য কোন প্রয়োজন না থাকলেও ইতিহাসের একটা দায় আছে। সে দায় মুক্তির খাতিরেই এর অবতারনা।
৮২ সালের কোন এক সকাল। চায়ের বাক্স রিক্সায় তুলে সে বাক্সের উপর আমি উঠে বসলাম। রিক্সা চালককে বললাম, ‘চলো চলো, বন্দর চলো।’ বন্দর মানে বন্দর বাজার, সিলেট শহরের আদি ব্যবসা-বানিজ্যের কেন্দ্রস্থল।
ঢাকা থেকে সিলেট এসেছি। সদ্য বিয়ে করেছি। চাকরি নেই। টাকা পয়সা নেই। যারা এক সময় খুব ঘনিষ্ট বন্ধু ছিল তারাও এখন ঘনিষ্ট নয়। এক বন্ধু আবদুল কাইয়ূম। আরেক বন্ধু মকবুল আহমদ। এ দু জন সাহায্যের হাত প্রসারিত করলেন। তাদের সাহায্য ছাড়া সিলেট শহরে আমার দাঁড়াবার ঠাঁই হতো না। আল্লাহ তাদের ভালো কাজের পুরস্কার দিবেন। মকবুল আহমদের স্ত্রী মনোয়ারা আহমদের বড় ভাই মোহাম্মদ ফারুক মৌলভীবাজার শহরে চায়ের ব্যবসা করেন। মোহাম্মদ ফারুক চট্রগ্রাম থেকে নিলামে চা খরিদ করে আনেন। তিনি খরিদমূল্যে আমাকে চা সরবরাহ করতে সম্মত হলেন। আব্দুল কাইয়ূম দিলেন ব্যবসার পুজি। আম্বরখানা বাজারে একটা দোকান ভাড়া নিয়ে চা ব্যবসা শুরু করলাম। চা ব্যবসা মানে চয়ের দোকান নয়, চা-পাতার দোকান। সিলেট শহরে তখন বন্দর বাজার, মহাজনপট্টি এবং কালিঘাট ছিল ব্যবসার কেন্দ্র।
ফুট ফরমায়েশ এবং আমার অনুপস্থিতিতে দোকানে বসার জন্যে সামান্য বেতনে একটি ছেলে রাখলাম। ছেলেটির নাম বাবুল। বড়াপার পেছনের বাসায় থাকে, ভালো পরিবারের ছেলে। ফারুক ভাই নিলামে চা কিনে আমার কাছে পাঠিয়ে দিতেন। ১৫/২০টা চায়ের বাক্স এক সাথে পাঠাতেন। কয়েকটা বাক্স খুলে পলিথিনের প্যাকেট করে দোকানে সাজিয়ে রাখতাম খুচরা বিক্রির জন্যে। বাকিগুলো বন্দরবাজার, কালিঘাট এবং মহাজনপট্টির কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছে অল্প লাভে বিক্রি করে দিতাম। তাদের কাছে চায়ের বাক্স রিক্সায় করে নিজেই নিয়ে যেতাম। কোন সময় বাবুলকে দিয়ে পাঠাতাম। চায়ের বাক্সের উপর বসে বন্দর বাজার, মহাজনপট্টি এবং কালিঘাটে চক্কর দেয়া প্রতি মাসের কাজ ছিল।
সারাদিন ব্যস্ত সময় কাটতো। অপেক্ষা করতাম কখন সন্ধ্যা হবে। সন্ধ্যার পর ছোট্ট চায়ের দোকানে বন্ধুদের অনেকে আসতেন। তরুণ সাহিত্যকর্মীদের সাথে মুরব্বীরাও আসতেন। স্বানমধন্য গবেষক অধ্যাপক আসাদ্দর আলী আসতেন। সিলেট আলীয়ার উস্তাদ মাওলানা জহুর আহমদ আসতেন। প্রায়ই আসতেন দুজন প্রিয় বন্ধু হারুনুজ্জামান চৌধুরী এবং আব্দুল হামিদ মানিক। দোকান বন্ধ করে বেরিয়ে পড়তাম তাদের সাথে আড্ডা দিতে। কখনো যেতাম চায়ের দোকানে গরম পিয়াজু অথবা হারুনুজ্জামান চৌধুরীর প্রিয় শিক কাবাব খেতে। কখনো যেতাম বিভিন্ন পত্রিকা অফিসে। আব্দুল হামিদ মানিক তখন চাকরি করতেন মুকতাবিস-উন-নূরের সম্পাদনায় প্রকাশিত সিলেট কন্ঠে। হারুনুজ্জামান চৌধুরীছিলেন সাপ্তাহিক জালালাবাদ’র সম্পাদক। প্রধানতঃ এ দুটি পত্রিকার অফিসেই আমরা যেতাম। বাসায় ভালো খাবার থাকলে মাঝে মাঝে দু জনকে নিয়ে বাসায় চলে আসতাম।
সিলেট শহরে আমি অপরিচিত ছিলাম না। দীর্ঘদিন এ শহরে থেকে লেখাপড়া করেছি। রাস্তায় মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছি, বন্দর এবং কোর্ট পয়েন্টে বক্তৃতা করেছি। সাহিত্য সভায় কবিতা পড়েছি, সুধী সমাবেশে আলোচনা রেখেছি। শহরে অনেক বন্ধু, অনেক আত্মীয়-স্বজন এবং অনেক পরিচিত জন রয়েছেন। আমার অবস্থা দেখে কেউ মুখ টিপে হাসতো। কেউ রিক্সা থামিয়ে কুশল জিজ্ঞাসা করতো। কেউ হঠাৎ দেখে চমকে উঠতো। বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞেস করতো, ‘রেজা ভাই? কবে এলেন?’
বলতাম, ‘আসিনি, আছি।’
– কোথায় আছেন?
– শাহী ঈদগাহ, সৈয়দ পুর হাউস।
– নিজের বাসা?
– না, দুলাভাইয়ের বাসা। তবে সৈয়দ পুর হাউস নামটা আমার দেয়া।
– সেই সুবাদে আছেন?
– না, তাদের অনেকগুলো বাসা আছে। একটিতে আমি ভাড়া থাকি।
– বাসায় কে কে আছেন?
– আমি আর আমার বউ। ছোটভাই ময়েজ। আম্মা-আব্বা মাঝে মাঝে আসেন।
– কি করেন?
– দেখছেন না কি করছি? আম্বরখানায় চা-পাতার ব্যবসা করি।
– চা-পাতার ব্যবসা!
– কেন, এটা কি দোষের? আমি কি চুরি করছি?
– না, চুরি নয়। তবে ব্যবসা করলে বড় কিছু করবেন। নতুবা বড় কোন চাকরি করবেন। সবচেয়ে বড় কথা, ঢাকায় থাকবেন। সিলেটে আপনাকে মানায় না। ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রিয় নেতা আম্বরখানায় চা-পাতার ব্যবসা করবেন, এটা মেনে নেয়া যায় না।
– আপনি না মানলেও আমি মেনে নিয়েছি।
এ কথোপকথন কাল্পনিক নয়, বাস্তব। একবার নয়, বার বার এ সকল কথার জবাব দিতে হয়েছে। আমার বড়াপা একদিন বললেন,
– তোমার ভাগিনা কি বলে জানো?
– কি বলে?
সে বলে, ‘বড়মামা এতো লেখাপড়া করে চায়ের পাতার ব্যবসা করেন এটা বলতে লজ্জা লাগে।’
বন্ধুরা যা-ই বলুক এবং ভাগিনারা যা-ই ভাবুক, এ ভাবেই সিলেটে আমার নতুন জীবন শুরু হয়।
ঢাকার অনেক বন্ধুর কাছেও প্রশ্ন ছিল, কেন আমি সিলেট চলে এলাম? কেন ঢাকায় থাকলাম না? কিন্তু আমার কাছে এটা কোন প্রশ্নই ছিল না। সে সময় আমার কাছে বড় প্রশ্ন ছিল, কেন ঢাকায় এলাম? বাইরে ছিলাম, অনেক ভালো ছিলাম। অনেক স্বপ্ন ছিল, অনেক সুধারণা ছিল, অনেক আশা ছিল। ঢাকায় গিয়ে দীর্ঘদিন স্বযত্নে লালিত স্বপ্নসৌধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
আসলে আমার ঢাকায় আসার কথা ছিল না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম। চট্টগ্রাম শহরের দায়িত্বে ছিলাম। এমএ পরীক্ষার শেষ দিন ইউনিভার্সিটি এপ্রোচে এসে ভার্সিটিকে সালাম জানিয়ে বলেছিলাম, বিদায় বিশ্ববিদ্যালয়, বিদায়! পাশ করলেও বিদায়, ফেল করলেও বিদায়। আর ছাত্র হিসেবে তোমার অঙ্গনে পা দেবো না। পাশ করলে সিলেটের কোন কলেজে মাস্টারি জোগাড় করে লেখালেখির জগতে চলে যাব। এমএ পাশ করতে না পারলে দেখবো সিলেটে কোন পত্রিকায় সুযোগ পাওয়া যায় কি না। বিয়ে করবো, মা-বাবার সাথে থাকবো, লেখালেখি করবো। কিন্তু এম এ পরীক্ষার ফল বের হবার আগেই সব কিছু ওলট-পালট হয়ে গেলো।

Tuesday, 16 June 2015

How an Indian prominent journalist sees Bangladesh Prime Minister Sheikh Hasina in his realization


“Prime minister Modi,s visit to dhaka was to shore up support for declining image of Hasina. This untimely visit has increased anti-Indian sentiments because New Delhi is not seen as neutral.” This is the opinion of a prominent journalist and a former diplomat of India Kuldip Nayar. He states in today’s “The Statesman”  I do not know why and for how long we have to support the authoritarian rule by Prime Minister Hasina in Bangladesh. True, she is the daughter of Sheikh Mujib-ur Rehman, who liberated East Pakistan from distant and oppressive West Pakistan. But that does not give her the right to flout the Constitution and accepted norms.”

“Bangladesh, a product of the people’s right to a say in governance, has lost the vigour of expression which the nation once had. This is a sad development by itself. But it becomes all the more poignant when the person changing it is from the family which liberated the people from the clutches of West Pakistan.”

“No one else is to blame except Hasina. She is herself extinguishing the flame of democracy. That it should be done by the daughter of Sheikh Mujib is not only disappointing but also disconcerting. That she can shackle the nation still further is a harrowing thought. But it can happen since she has effaced the lines between right and wrong, moral and immoral.”

In this atmosphere of Hasina representing a dictatorial figure, Modi’s visit was all the more unfortunate. He should have said somewhere while in Bangladesh that the country was a product of revolution and it should continue to radiate the same kind of thoughts. But he preferred to placate her even though the people of Bangladesh were disappointed because they expected India to give some sign that it is not happy with the way Hasina is functioning.”

He pointed out the vote rigging of recent Dhaka Municipal polls by the rulling Awamileage to the horror of voters and othe neutral observers. He accept the fact the had BNP went to the polls in the last election, Hasina would have made every attempt and would have gone to any extent to win the election. It is surprising that many in Bangladesh don’t see accept that Hasina is a dictator while an Indian from New Delhi is able to see and conclude the truth that there is no democracy in Bangladesh. The solution to our problem is not staying silent and not doing anything about it, rather the solution is doing something and letting the dictaor know that we will not be silent.

Wednesday, 11 February 2015

Indian government should reflect deeply on Bangladesh crisis


The west, especially the USA is always in the habit of taking advantage of political instability in 3rd world countries. Today’s visit by the EU diplomat to Sheikh Hasina and USA newly appointed diplomat recent meeting with government official, partly underscores this notion that behind all their apparent show, there rest a hidden agenda and that is to secure maximum economic benefits for their multinational companies to the detriment of national and local interest of Bangladeshi businesses. I do not believe the USA has a genuine intention to restore democracy in Bangladesh. There is a sinister motive behind the motive of USA which is very deep and has more to do with china’s rise in the world stage. The weak and unpopular Bangladeshi government are more incline to give away to foreign demands more easily than a democratically elected legal government. If you look at their recent statements on Bangladesh, you would notice that in every instance their visit subject matter is always more to do with securing their business interest than genuinely seeking for an end to political impasse. Instead of pressuring the unpopular and illegally elected government to step down, they indirectly supports the government by alluding to put blame on opposition for violence. They intentionally avoid mentioning or condemning government law enforcement agencies for indiscriminate killings of protesters in the name of cross fire, and in many cases forceful abduction and subsequent killings of opposition activists. It is widely reported that many of the recent petrol bomb attack on innocent people were instigated by direct orders of the ruling Awami party Ministers and MP’s to demonise the opposition in order to turn opinion against the opposition. But this ploy by the government is proving to be ineffective, as the general populace does not believe in government propaganda, since all the evidence based on police and impartial media reports proves otherwise. Unlike the position taken by foreign diplomat in Bangladesh who intentionally avoids accepting the truth that acts of petrol bomb attack are a false flag operation instigated by the government for propaganda purposes. In any case, some act of violence that may come from the opposition activists are a natural reaction of police brutality on the opposition activists and due to long term suppression of their political rights. This trend is bound to increase with time if political rights are not restored.

What is surprising is that our neighbour Indian government fails to understand how cleverly the USA is manipulating politics in that region for  their own geo-political interest. The USA is very cleverly building up instability and fermenting political tension in Bangladesh so that in the long run this will lead to instability in Indian seven sisters, increase in militant activities, which is always the case when political rights are being suppressed, and this no doubt, will create opportunities for the USA to be actively involved in military activities in the name of preventing terrorism, as is the case in Afghanistan, Iraq, Yemen, and Ukraine. Suppressing rights of any population does not help in the long term to bring peace , progress and instability in any country rather this kind of political suppression always leads to violence and militancy, which no doubt, will spread to the neighbouring country India. Neighbour India should have been cleverer to understand that a stable, peaceful, and democratic government based on strong and genuine democratic institution mandated by the free votes of people will best serve Indian interest in Bangladesh, and in the long term this will put an end to the USA back door political influence in the region. India’s present Modi government must seek to address Bangladesh issue in good faith if it wants a stable future for its bordering states and this can never be achieved by supporting fascist Hasina government or staying on the middle of the fence.